বন্ড সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

আর্থিক খাতে বিনিয়োগের জন্য অন্যতম পণ্য বন্ড। যেকোনো ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে। ব্যাংকের আমানত বা ডিপোজিট রেখে যে সুদ পাওয়া যায়, সাধারণত বন্ডের মুনাফা বা সুদ তার চেয়ে কিছুটা বেশি দেওয়া হয়। এ কারণে বন্ড এখন বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় পণ্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।  সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন ব্যাংক ও কোম্পানির বিপরীতে বন্ড ইস্যু করছে। এসব বন্ডের কোনো কোনোটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে লেনদেন হচ্ছে। আবার কিছু বন্ড কেনাবেচা হচ্ছে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে। আছে সরকারের ট্রেজারি বন্ড। প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে যেসব বন্ড ইস্যু করা হয়, সেগুলো শেয়ারবাজারের মাধ্যমে কেনাবেচা করা যায় না। সাধারণত বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান বা বন্ডের ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব বন্ড কেনাবেচা করতে হয়।
 
 
 

শেয়ার ও বন্ডের পার্থক্য কি?

শেয়ার হচ্ছে কোম্পানির মালিকানার অংশ। আপনি কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনছেন মানে ওই কোম্পানির মালিকানার অংশীদার হচ্ছেন। কোম্পানি লাভ করলে সেই ক্ষেত্রে বছর শেষে ঘোষিত লভ্যাংশের বিপরীতে শেয়ারের আনুপাতিক হারে মুনাফা বা লভ্যাংশ পাবেন। এমনকি কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগেরও ক্ষমতা থাকবে। সাধারণত বার্ষিক সাধারণ সভা বা এজিএমে এ ভোটাধিকার প্রয়োগ করা যায়। আর বন্ড হচ্ছে ঋণ পণ্য। বন্ডে বিনিয়োগের সঙ্গে মালিকানা অর্জনের কোনো বিষয় নেই। শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বছর শেষে কোম্পানির লাভের ওপর নির্ভর করে মুনাফা বা লভ্যাংশ মেলে। আর বন্ডের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত সুদ বা মুনাফার নিশ্চয়তা থাকে।
 
 
 

বন্ড কত ধরনের ও কারা ইস্যু করে?

বন্ড হচ্ছে একধরনের ঋণপত্র। এ বন্ড বিক্রি করে সাধারণ মানুষ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মূলধন বা অর্থ সংগ্রহ করে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান। সরকার থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ের কোম্পানি যে কেউ বাজারে বন্ড ইস্যু বা ছাড়তে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণত ট্রেজারি বন্ড ছেড়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত সরকারের হয়ে ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর সরকারের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি যে বন্ড ইস্যু করে, তার অনুমোদন দেয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি। তবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বন্ড ছাড়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও অনুমতির দরকার হয়।

সাধারণভাবে আমাদের দেশে বন্ড দুইভাবে পরিচিত—
  • প্রথমটি ট্রেজারি বন্ড, 
  • দ্বিতীয়টি করপোরেট বন্ড। 
 
করপোরেট বন্ডের মধ্যে আবার দুটি ভাগ আছে। এর 
  • একটি ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বন্ড, বর্তমানে যা দেশে সুকুক বন্ড হিসেবে পরিচিত।
  • আর অন্যটি প্রচলিত বা কনভেনশনাল বন্ড। 
 
কনভেনশনাল বন্ড আবার কয়েক ধরনের। তার মধ্যে রয়েছে 
  • পারপিচুয়াল বন্ড ও 
  • জিরো কুপন বন্ড।
 
 

করপোরেট কোম্পানির বন্ড কি সবাই কিনতে পারে?

সাধারণত সব বন্ড সবাই কিনতে পারে না। বন্ড ইস্যুর আগেই ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি নিজেরাই ঠিক করে নেয় কাদের কাছে তারা এ বন্ড বিক্রি করবে। সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে বন্ডের অনুমোদন নেওয়া হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিশ্রেণির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বন্ড ইস্যু করে, সেসব বন্ড প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মতো শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে কেনা যায়। সেই ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। আর যেসব বন্ড শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, সেগুলো শেয়ারবাজার থেকে যখন খুশি তখন কেনাবেচা করা যায়।



বিভিন্ন ধরনের বন্ড

কুপননির্ভর বন্ড হচ্ছে এমন বন্ড, যার বিপরীতে মুনাফা বা সুদ নির্দিষ্ট করে কুপন ইস্যু করা হয়। এ ধরনের বন্ড আবার দুই রকমের। 
  • পারপিচুয়াল বা স্থায়ী বন্ড, ও 
  • অবসায়িত বা মেয়াদি বন্ড 
 
পারপিচুয়াল বন্ডের কোনো মেয়াদ থাকে না। এটি মেয়াদহীন একটি বন্ড। আর মেয়াদি বন্ড নির্ধারিত মেয়াদ শেষে অবসায়িত বা বাতিল হয়ে যায়

সাধারণত পারপিচুয়াল বন্ডে কুপন বা সুদের হার নির্ধারিত থাকে। বিনিয়োগকারীরা সে অনুযায়ী সুদ পেয়ে থাকেন। পারপিচুয়াল বন্ডের ক্ষেত্রে কুপনে সুদহার নির্ধারিত থাকে। সে অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পরপর মুনাফা পাবেন বিনিয়োগকারী। তবে এ মুনাফা বা কুপন হার সময়ে-সময়ে পরিবর্তন হতে পারে। যেহেতু এ ধরনের বন্ড মেয়াদহীন, তাই কেউ চাইলে কয়েক বছর পর তা বিক্রি করে আসল অর্থ তুলে নিতে পারবেন। যে প্রতিষ্ঠান এ ধরনের বন্ড ইস্যু করে, তাদের মাধ্যমে বা ওই কোম্পানির মনোনীত প্রতিনিধির মাধ্যমে তা কেনাবেচা করতে হবে।

অন্যদিকে জিরো কুপন বন্ডও একটি মেয়াদি বন্ড, যা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ইস্যু করা হয়জিরো কুপন বন্ডে কোনো সুদ নির্ধারিত থাকে না। এ বন্ড বিক্রি হয় সাধারণত ডিসকাউন্ট বা সাশ্রয়ী দামে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো একটি কোম্পানি জিরো কুপন বন্ড ছেড়ে এক কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। ওই বন্ডের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু এক হাজার টাকা। কোম্পানিটি এ বন্ড সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিটি ৮০০ টাকা মূল্যে অর্থাৎ ডিসকাউন্টে বিক্রি করল। যিনি এ বন্ডে বিনিয়োগ করবেন, তিনি ২০০ টাকা কমে সেটি কিনতে পারবেন—এই দুই শ টাকাই তাঁর মুনাফা। তবে মেয়াদ শেষে ওই ব্যক্তি অভিহিত মূল্যের হিসাবে বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাবেন

 
 

কেন বন্ডে বেশি সুদ দেওয়া হয়?

বন্ড ছেড়ে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি মূলত অর্থ সংগ্রহ করে। অর্থ সংগ্রহ করা সব সময়ই কষ্টসাধ্য একটি বিষয়। তার জন্য মূল্যও দিতে হয়। আরেক দিক থেকে যাঁরা বিনিয়োগ করেন, তাঁদের ঝুঁকিও বেশি। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি যদি কখনো কোনো কারণে দেউলিয়া হয়ে যায়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের যা সম্পদ আছে, তা বিক্রি করে সবার আগে আমানতকারীর দায় মেটানো হয়। সব পাওনা পরিশোধের পর যদি কিছু থেকে যায়, তবে সেখান থেকে কিছু অর্থ ফেরত পান অর্থ জোগানদাতারা। এ কারণে অর্থ জোগানদাতাদের আমানতকারীর চেয়ে কিছুটা বেশি সুদ দেওয়া হয়।
 
 
 
বন্ড সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
 
 

সরকারি ট্রেজারি বন্ড সবচেয়ে নিরাপদ

দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী সুদের হারের এই বন্ডটির নাম “বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড” বা “বিজিটিবি”। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করে এই বন্ড। তাই এটি দেশের প্রধান গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিস বা জি-সেক এবং সর্বোচ্চ ঝুঁকিমুক্ত বন্ড।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত ট্রেজারি বন্ডের নিলাম হয়। মুনাফা পাওয়া যায় প্রতি ছয় মাস পর পর। প্রতিটি বন্ডের অভিহিত মূল্য ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ম ১ লাখ টাকার বন্ড কিনতে হবে। কেউ চাইলে এর বেশি ২ লাখ, ৩ লাখ বা ৫ লাখ টাকা বা আরও বেশি অঙ্কের বন্ড কিনতে পারেন। বর্তমানে বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ৫ দশমকি ১০ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ৭ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ, ১৫ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ১০ থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশ এবং ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ৯ থেকে ১৪ শতাংশ।

এছাড়াও যে কোনো ব্যাংকের মাধ্যমেও এসব বন্ডে বিনিয়োগ করা যায়। এর মধ্যে যে ব্যাংকের শাখায় গ্রাহকের হিসাব রয়েছে ওই ব্যাংকেই বন্ড কেনার অর্ডার দিতে হবে। ওই শাখা পাঠাবে তা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কার্যালয়ে। ওই কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি হিসাব পরিচালনা করা হয়।

এই বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারী ব্যক্তি ট্যাক্স রিবেট সুবিধা পান, অর্থাৎ তার আয়করের পরিমাণ কমে আসে।

সঞ্চয়পত্র এক বছরের আগে যেকোনো সময় নগদায়ন করা বা ভেঙে ফেলা হলে কোনো মুনাফা পাওয়া যায় না বরং অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। কিন্তু টি-বন্ড মেয়াদপূর্তির পূর্বে যেকোনো সময় বিক্রিতে কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই।



সরকারি ট্রেজারি বন্ড কোথা থেকে কিনবেন?

ব্যাংক বা পুঁজিবাজার থেকে ট্রেজারি বন্ড কেনা যায়। তবে সব ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে না। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োজিত ডিলার ব্যাংকই ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে। যে ব্যাংক ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে, সেই ব্যাংকে হিসাব খুলে এ বন্ড কেনা যাবে। আর শেয়ারবাজারের মাধ্যমে বন্ড কেনার ক্ষেত্রে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাব থাকতে হবে।

ট্রেজারি বন্ড মেয়াদপূর্তির আগে নগদায়ন করা যায়। সে ক্ষেত্রে যে ব্যাংক থেকে ট্রেজারি বন্ড কেনা হয়, ওই ব্যাংকের মাধ্যমেই তা নগদায়নের সুযোগ রয়েছে। আর পুঁজিবাজার থেকে কেনা হলে পুঁজিবাজারেই তা যেকোনো সময় বিক্রয় করা যায়।

 

 

ট্রেজারি বন্ড কেনার উপায়

সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের পদ্ধতি দুটি। একটি নিলামের মাধ্যমে এবং অন্যটি সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে। প্রতি মাসেই টি-বন্ডের প্রাইমারি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। বার্ষিক নিলাম ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই নিলামে অংশ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা টি-বন্ড কিনতে পারেন। এর জন্য তাদেরকে প্রাথমিক ডিলারদের (পিডি) মাধ্যমে নিলামে অংশ নিতে হয়। কারণ নিলামে শুধুমাত্র পিডিদেরই নিলামে বিড জমা দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। এই পিডি সাধারণত ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর মতো বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়ত, সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে সাধারণ পণ্য কেনাবেচার মতো যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি টি-বন্ড ক্রয় করতে পারেন। তবে সব ব্যাংকেই সরকারি বন্ড বিক্রির অনুমতি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোই শুধু এই বন্ড বিক্রি করতে পারে।



প্রাথমিক নিলাম থেকে ট্রেজারি বন্ড ক্রয়

প্রাথমিক নিলামের মাধ্যমে টি-বন্ডে বিনিয়োগ করতে হলে বিনিয়োগকারীদের নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে হয়:

- প্রথমেই বিনিয়োগকারী তার হয়ে প্রাথমিক নিলামে অংশগ্রহণের জন্য পিডিকে অনুমোদন দেন। এর জন্য বন্ডের টাকার পরিমাণ, মেয়াদ, সুদের হার এবং নিলামের তারিখ উল্লেখ করে বিনিয়োগকারীকে পিডি বরাবর একটি লিখিত নির্দেশনা পাঠাতে হয়। সাধারণত প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এই নিলাম হয়ে থাকে। বার্ষিক নিলাম ক্যালেন্ডারের লিংক- https://www.bb.org.bd/en/index.php/monetaryactivity/auc_calendar

লিখিত অনুমোদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর পক্ষ হয়ে পিডি প্রাথমিক নিলামে বিড করতে পারে। এই নির্দেশনা নিলামের একদিন আগে পিডির কাছে পাঠাতে হয়।

- পরবর্তী বিভিন্ন লেনদেন নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিনিয়োগকারীকে পিডি-এর অধীনে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এটি পিডি অ্যাকাউন্ট নামে গণ্য হয়। আর শেয়ার মার্কেটের ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউজের অধীনে খোলা অ্যাকাউন্টকে বেনেফিশারি ওনার বা বিও অ্যাকাউন্ট বলা হয়।

- বন্ডের টাকা নিলামের আগের দিন দুপুর ১২টার আগে পিডির কাছে জমা করতে হয়। বন্ডের অর্থ যে মাধ্যমেই পাঠানো হোক না কেন তা অবশ্যই উক্ত সময়ে পিডির কাছে থাকতে হয়।

- নিলামের তারিখের দিন শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিড ফলাফল প্রকাশ করে। অতঃপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শের ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদেরকে পিডি সেই বন্ডের জন্য একটি বরাদ্দপত্র দেয়।




সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে ট্রেজারি বন্ড ক্রয়

এ পদ্ধতিতে বন্ড কেনার জন্য বিনিয়োগকারীকে যে পদক্ষেপগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা হলো:

- প্রথমে বিনিয়োগকারী নিজের জন্য উপযুক্ত সুদের হার ও মেয়াদ সম্পন্ন টি-বন্ড নির্বাচন করে তা পিডিকে জানাবে। অতঃপর পিডি ও বিনিয়োগকারী উভয় পার্টি বন্ডের মূল্য, মেয়াদ এবং পরিমাণের বিষয়ে সম্মত হবেন।

- পিডি বন্ডের সমস্ত প্রয়োজনীয় বিবরণ উল্লেখ করে বিনিয়োগকারীর কাছে একটি চুক্তি নিশ্চিতকরণ পাঠাবে।

- বিনিয়োগকারী বন্ড ক্রয়ের মূল্যের সমপরিমাণ তহবিল পিডির অ্যাকাউন্টে জমা করবেন।

- তহবিল নিশ্চিতকরণের পর পিডি বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্টে বন্ড স্থানান্তর করবে।



সরকারি ট্রেজারি বন্ডের লাভ-ক্ষতি হিসাব পদ্ধতি

সুদ বা কুপন অথবা মূলধনী লাভ বা ক্ষতি- এই দুই পদ্ধতিতে বন্ডের লাভ-ক্ষতি হিসাব হয়। টি-বন্ডে সুদের হার বা কুপন রেট নির্দিষ্ট মেয়াদকালের মধ্যে ঐ বন্ডের জন্য আর পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ ১০% কুপন রেটে এক লাখ টাকা ১০ বছর ধরে রাখা হলে প্রতি বছর ১০ হাজার টাকা করে ১০ বছরে মোট এক লাখ টাকা পাওয়া যাবে।

মূলধনী লাভ বা ক্ষতি মূলত বন্ডটি কত দিন ধরে রাখা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে। বন্ডটি কেনার পর থেকে যদি মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত ধরে রাখা হয়, তাহলে এতে কোনো লাভ বা ক্ষতি নেই। কিন্তু মেয়াদপূর্তির আগেই বন্ড বিক্রি করলে লাভ কিংবা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

খুব সহজ হিসাব- যদি ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যায় তাহলে মূলধনী লাভ। আর বন্ড কেনার সময়ের দাম থেকে বিক্রির সময় কম দাম পেলে ক্ষতি।

এই মূলধনী লাভ বা ক্ষতির সঙ্গে মোট সুদের পরিমাণ একত্রিত করে বন্ডের মোট লাভ বা ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১০% কুপন রেটের বন্ডে এক লাখ টাকা ১০ বছরের জন্য বিনিয়োগ করেছেন এবং তিন বছরে ৩০ হাজার টাকা সুদ পেয়েছেন। তিন বছর মেয়াদপূর্তির পর আপনি বন্ডটি এক লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে ফেলেছেন যার হলে আপনার ১০ হাজার টাকা মূলধনী লাভ হয়েছে। এখন তিন বছরে এই বন্ড থেকে আপনার মোট লাভের পরিমাণ দাঁড়ালো (৩০ হাজার + ১০ হাজার) টাকা অর্থাৎ ৪০ হাজার টাকা।

অন্যথায়, তিন বছর মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর বন্ডটি ৯৬ হাজার টাকায় ছেড়ে দিলে মূলধনী ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে চার হাজার টাকা। তখন বন্ড থেকে মোট লাভ হচ্ছে (৩০ হাজার - ৪ হাজার) টাকা তথা ২৬ হাজার টাকা

 

আরো তথ্যর জন্যঃ 

 

 বর্তমানে ব্যাংক, পুঁজিবাজার, ব্রোকারেজ হাউস ও বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ড কেনার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ব্যাংক এই সেবা দেয় না। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োজিত ডিলার ব্যাংকই ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে। পাশাপাশি সহযোগী কিছু ব্যাংকও এই সেবা দিয়ে থাকে। তাই বিনিয়োগের আগে খোঁজ নিতে হবে, যে ব্যাংকে আপনার হিসাব রয়েছে, ওই ব্যাংক ট্রেজারি পণ্য বিক্রি করে কি না। যদি না করে, তাহলে যে ব্যাংক ট্রেজারি পণ্য বিক্রি করে, সেই ব্যাংকে হিসাব খুলে কিনতে হবে। আর শেয়ারবাজার থেকে কেনার ক্ষেত্রে আপনার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স বা বিও হিসাব থাকতে হবে। মূলত ট্রেজারি ব্যাংকের মাধ্যমে কিনতে আপনার নামে বিপি হিসাব খুলতে হবে। দেশে ট্রেজারি ব্যাংক রয়েছে ২৪টি। এর মাধ্যমে বিল ও বন্ড দুটোই কেনা যায়। শেয়ারবাজারের মাধ্যমে শুধু বন্ড কেনা যায়।    

আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আপনি ব্যাংক নাকি শেয়ারবাজার থেকে ট্রেজারি পণ্য কিনবেন। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ট্রেজারি বন্ডের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু ১০০ টাকা অর্থাৎ আপনি চাইলে ১০০ টাকাও বিনিয়োগ করতে পারবেন একটি ট্রেজারি বন্ডে। তবে ব্যাংক থেকে কেনার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। ব্যাংক থেকে ন্যূনতম এক লাখ টাকার ট্রেজারি বন্ড কিনতে হয়। তাই আপনি যদি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হন, তাহলে আপনার জন্য পুঁজিবাজার থেকে বন্ড কেনা ভালো। আপনি যদি অনাবাসী বাংলাদেশি হন, তাহলে ব্যাংক থেকে বন্ড কেনা আপনার জন্য সহজ। এতে আপনি আপনার বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা ডলারে ফেরত নিতে চাইলে সহজেই তা ফেরত নিতে পারবেন।