বার্ড ফ্লু

বার্ড ফ্লু সাধারনভাবে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা জাতীয় একটি রোগ। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নামক ভাইরাসের সংক্রমনে এই রোগ হয়। বার্ড ফ্লুকে, বার্ড ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং এভিয়ান ফ্লু নামেও ডাকা হয়। ভাইরাস বাহিত এই রোগটি পাখিদের সংক্রমিত করে। পাখিরা খুব দ্রুত একস্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে বলে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আবার প্রকৃতিতে স্বাধীন ভাবে বিচরন করা পাখির মাধ্যমে এই রোগ সহজেই গৃহপালিত পাখিতে সংক্রমিত হয়। গৃহপালিত পাখি থেকে এটা খামারিদের মাঝেও ছড়াতে পারে। এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের চারটি সাব টাইপ হল H5 N1, H7N3, H7N7 এবং H9N2। এর মধ্যে H5N1 ভাইরাসটিকেই মূলত বার্ড ফ্লু এর জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বর্তমানে বার্ড ফ্লু নিয়ে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য একক ভাবে এই ভাইরাসটিকেই দায়ী করা হয়।



বার্ড ফ্লু এর লক্ষন
সাধারণত সংক্রমণের ১-৩ দিন পর সাধারন ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই রোগীর ঠাণ্ডার লক্ষণ প্রকাশ পায় যেমন- জ্বর, গা ব্যথা, গা ম্যাজম্যাজ করা, ঠান্ডা লাগা, হাঁচি, কাশি, মাথাব্যথা, মাংসপেশি ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা ইত্যাদি। বার্ড ফ্লুর লক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে খুব সামান্য হতে পারে আবার অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত তীব্র হতে পারে যেখানে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরবর্তীতে অবস্থা জটিল হলে অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংক্রমণ বা এনসেফালাইটিস, হৃৎপিণ্ডের সংক্রমণ বা মায়োকার্ডাটাই, মাংসপেশিতে সংক্রমণ বা মায়োসাইটিস ইত্যাদি হতে পারে। বার্ডফ্লু হলো ইনফ্লুয়েঞ্জার তীব্র একটি রূপ।





কিভাবে ছড়াতে পারে
  • আক্রান্ত পশুপাখির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে অথবা বর্জ্য থেকে বার্ড ফ্লু হতে পারে।
  • আবার আক্রান্ত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে অন্য ব্যক্তির মাঝে বার্ড ফ্লু ছড়াতে পারে।
  • আক্রান্ত পাখির ডিম বা মাংস খেলে বার্ড ফ্লু হতে পারে।


রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা
বার্ডফ্লু নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, রক্তে এই ভাইরাসের এন্টিবডি পিসিআর পদ্ধতিতে দেখে ভাইরাসটি সনাক্ত করা যায়। সাধারণত ভাইরাস কালচার বা ভাইরাস এনটিজেন, আর এন এ আর টি পি সি আর দিয়ে নাক ও মুখগহ্বর থেকে লালার নমুনা নিয়ে এই রোগ নির্ণয় করা হয়ে থাকে।


বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে করনীয়
এটি ভাইরাসজনিত একটি ছোঁয়াচে রোগ। এই রোগের জীবাণু বার্ড ফ্লু আক্রান্ত হাঁস-মুরগি বা অন্যান্য পাখির মল, রক্ত ও শ্বাসনালীতে বাস করে। মানুষও বিভিন্ন কারনে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারনত যারা আক্রান্ত পাখির সংস্পর্শে এসেছে, জবাই বা পালক ছাড়ানোর কাজ করেছে তাদের এ রোগটি হতে পারে। আবার অনেক শিশু আক্রান্ত পাখি বা মৃত হাঁস-মুরগি নিয়ে খেলা করে। তারাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এটি প্রথমে সাধারণ ফ্লুর মত শুরু হলেও পরবর্তীতে মারাত্মক নিউমোনিয়ার আকার ধারণ করে, যার পরিণতিতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। নিম্নলিখিত বিষয় সমুহ মেনে চললে এবং একটু সতর্ক হলে বার্ডফ্লু প্রতিরোধ করা সম্ভব। যথা-
  • খালি হাতে অসুস্থ্য বা অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এমন হাঁস বা মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরা বা নাড়াচাড়া করা যাবে না।
  • অসুস্থ্য হাঁস, মুরগি জবাই করা বা পালক ছাড়ানো অথবা নাড়াচাড়া করা যাবে না।
  • অসুস্থ্য হাঁস, মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরা এবং সেগুলো নিয়ে খেলাধুলা করা থেকে শিশুদের বিরত রাখতে হবে।
  • আক্রান্ত পাখিদের বিষ্ঠায় অতিরিক্ত পরিমানে এই ভাইরাস পাওয়া যায়। তাই যারা ঘরে পাখি পালন করেন তাদের ঘরে পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে শিশু ও বড়দের মধ্যে জীবাণু সংক্রমনের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
  • হাঁস, মুরগি বা পশুপাখি ধরার পর ভালো করে সাবান বা ছাই এবং পানি দিয়ে দুই হাত ভালভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
  • হাঁস, মুরগি বা পশুপাখির ঘরে কাজ করার ক্ষেত্রে, কাপড় দিয়ে নাক ও মুখ ভালভাবে ঢেকে নিতে হবে। পশুপাখি নাড়াচাড়ার পর হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করা যাবে না।
  • আক্রান্ত হাঁস-মুরগি মেরে ফেলুন ও মাটিতে পুতে ফেলুন। মৃত হাঁস-মুরগি বা পাখি মাটিতে পুঁতে ফেলার সময় অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে মৃত হাঁস-মুরগি বা পাখিকে ধরার জন্যে গ্লাভস/মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। গ্লাভস/মাস্ক না পাওয়া গেলে মোটা পলিথিন বা শুকনো কাপড় ব্যবহার করা যেতে
    ডাস্টবিন ব নদীনালায় ফেলবেন না।
    পারে। ডাস্টবিন বা নদীনালায় ফেলবেন না।
    ডাস্টবিন ব নদীনালায় ফেলবেন না।
    ডাস্টবিন ব নদীনালায় ফেলবেন না।
  • বার্ড ফ্লু আক্রান্ত এলাকা অর্থাৎ যেখানে এ রোগ ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এমন স্থানে বা তার আশপাশে যারা বাস করেন, তাদের হাঁস, মুরগি বা অন্যান্য পাখি ক্রয় বিক্রয় বা জবাই করার স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে।
  • অসুস্থ্য হাঁস, মুরগি বা অন্যান্য পাখির মল সার অথবা মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
  • কোথাও হঠাৎ করে হাঁস, মুরগি বা অন্যান্য পাখি অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে, সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ড কমিশনার অথবা উপজেলা পশুসম্পদ দফতরে জানাতে হবে।
  • মৃত হাঁস, মুরগি এবং পাখি মাটিতে পুঁতে ফেলার সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
  • হাঁস, মুরগি বা অন্যান্য পাখি ধরার পর যদি কেউ জ্বর, সর্দি কিংবা কাশি জাতীয় কোনো রোগে ভোগেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং অবশ্যই রোগে আক্রান্ত বা মৃত হাঁস, মুরগির সংস্পর্শে আসার বিষয়টি চিকিৎসককে জানাতে হবে।
  • এ রোগটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম হলো হাঁচি বা কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেট। তাই আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখলে এর সংক্রমন থেকে নিরাপদে থাকা যেতে পারে।
  • আবার আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কিংবা কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেট, নিত্য ব্যবহার্য্য কোন স্থানে বা পাত্রে লেগে থেকেও সংক্রমন ঘটাতে পারে। যেমন- মোবাইল, রিমোট, টেলিফোন, টেবিল, চেয়ার, দরজার হাতল ইত্যাদি একজন সুস্থ্য ব্যক্তি হাত দিয়ে স্পর্শ করলে এবং ঐ হাত দিয়ে তার নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করলে, তা থেকে সুস্থ্য ব্যক্তির বার্ডফ্লু হতে পারে।
  • জনসমাগম বেশী এরুপ স্থানে, কারও না কারও এই রোগ থাকতেই পারে তাই ঐ সকল স্থানের কোনো কিছু স্পর্শ করে সাথে সাথে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করা যাবে না।
  • আবার সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নিলেও হাতে বার্ড ফ্লুর ভাইরাস থাকে না। এজন্য যাদের অনেক মানুষের সাথে মিশতে হয় তারা দিনে বেশ কয়েকবার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিরাপদে থাকতে পারেন।


চিকিৎসা
বার্ড ফ্লু রোগের কোনো প্রত্যক্ষ চিকিৎসা নেই। সাধারণত নিউরামিনিডেজ প্রতিরোধক, মুখে খাওয়ানোর এন্টিভাইরাল ওষুধ যেমন- টেমিফ্লু বা ওসেল্টামিভির ব্যবহারে বার্ডফ্লুর ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর। তাই বার্ডফ্লু হয়েছে সন্দেহ হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ সেবন শুরু করতে হবে। অপরদিকে যাদের পশুপাশির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বেশি, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধ হিসেবে এন্টিভাইরাল ওষুধ সেবন করতে পারেন।


বার্ড ফ্লু হলে কি মুরগীর মাংস বা ডিম খাওয়া যাবে?
না। ভুলেও না।


সবশেষে
বার্ড ফ্লুর ভাইরাস পাখি থেকে মানুষে সহজে ছড়ালেও মানুষ থেকে মানুষে অত সহজে ছড়ায় না। তবে বর্তমান সময়ে মহামারি আকারে দেখা দেওয়া H5N1 ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাই এ ব্যপারে সচেতন থাকতে হবে এবং একই সাথে অনেক মানুষের তীব্র মাত্রায় ফ্লু জাতীয় রোগ দেখা গেলে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা শুরু করতে হবে।