দুশ্চিন্তা যখন ব্রণ নিয়ে
প্রচলিত একটি কথা আছে, প্রতিকার থেকে প্রতিরোধ উত্তম। ব্রণ থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে আগে জানতে হবে ব্রণ কি, কেন হয়, কাদের হয়, কি করনীয়, চিকিৎসা কি।
প্রথমেই আমরা জানবো ব্রণ কি?
সেবাসিয়াস গ্রন্থি সেবাম নামে একপ্রকার তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসরণ করে যা ত্বককে মসৃণ রাখে। কোনো কারণে সেবাসিয়াস গ্রন্থির নালির মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেবাম নিঃসরণের বাধার সৃষ্টি হয় এবং তা ভেতরে জমে ফুলে উঠে যা ব্রণ (acne) নামে পরিচিত। ব্রণ তৈরি হওয়ার পর্যায়ে এর মুখ বন্ধ থাকায় সাদাটে দেখায়। বন্ধ নালির মুখে জমাকৃত কোষগুলি আস্ত আস্তে কালো হয়ে গেলে তাকে কালো ফোঁটা বলে। প্রায়ই ব্রণের চারপাশে প্রদাহ শুরু হয় এবং এর রং লাল দেখায়। এর উপর জীবাণু সংক্রমণ ঘটলে পুঁজ তৈরি হয়। বাইরে থেকে এদের ছোট দেখালেও এরা বেশ গভীর হতে পারে। এজন্য ব্রণে সংক্রমণ সেরে গেলেও মুখে দাগ থেকে যেতে পারে।
কেন হয়?
ব্রণের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত না হলেও সাধারণত দেখা যায় হজমের গোলমাল, সুরাপান, বয়ঃসন্ধিকালে কিংবা অন্যান্য কারণে অনেকের মুখে ব্রণ হয়।
ব্রণের প্রকারভেদঃ
- ট্রপিক্যাল একনি– অতিরিক্ত গরম এবং বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হলে পিঠে, উরুতে ব্রণ হয়ে থাকে।
- প্রিমিন্সট্রুয়াল একনি– কোনো কোনো মহিলার মাসিকের সাপ্তাহ খানেক আগে ৫-১০টির মতো ব্রণ মুখে দেখা দেয়।
- একনি কসমেটিকা– কোনো কোনো প্রসাধনী লাগাতার ব্যবহারে মুখে অল্প পরিমাণে ব্রণ হয়ে থাকে।
- একনি ডিটারজিনেকস– মুখ অতিরিক্ত ভাবে সাবান দিয়ে ধুলেও ( দৈনিক ১/২ বারের বেশি ) ব্রণের পরিমাণ বেড়ে যায়।
- স্টেরয়েড একনি– স্টেরয়েড ঔষধ সেবনে হঠাৎ করে ব্রণ দেখা দেয়। মুখে স্টেরয়েড, যেমন– বটানোবেট ডার্মোভেট জাতীয় । ঔষুধ একাধারে অনেকদিন ব্যবহারে ব্রণের পরিমান বেড়ে যায় ।
ব্রণ থেকে মুক্তির উপায় :
কিছু নিয়ম অবলম্বন করলেই ব্রণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। অনেকের ধারণা, কোনো বিশেষ খাবার খেলেই ব্রণ হয়ে থাকে। আসলে এটি ঠিক নয়। কোনো খাবার খেলে যদি ব্রণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে তবে সে খাবারটি বাদ দিতে হবে। তবে প্রচুর ফলমূল ও পানি খেতে হবে। মুখে বেশি ব্রণ থাকলে রাসায়নিক কোনো উপাদান বা কসমেটিক ব্যবহার করা ঠিক নয়, যথাসম্ভব প্রাকৃতিক বা হারবাল জিনিস ব্যবহার করা ভালো কারণ এতে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। বেশির ভাগ ব্রণ নিজস্ব পরীক্ষার মাধ্যমে সেরে ফেলা সম্ভব।
ব্রণ হলে কী করবেন:
- দিনে দুই-তিনবার হালকা সাবান বা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোবেন।
- ব্রণে হাত লাগাবেন না।
- তেল ছাড়া অর্থাৎ ওয়াটার বেসড মেকআপ ব্যবহার করবেন।
- মাথা খুশকিমুক্ত রাখার চেষ্টা করুন।
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন এবং নিজের জন্য আলাদা তোয়ালে রাখুন।
- রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
- মানসিক চাপ পরিহার করুন।
- প্রচুর পরিমাণে ফল, সবজি খান ও প্রচুর পানি পান করুন।
- কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে তা দূর করতে হবে।
- ঝাল-মশলাযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
- পুষ্টিহীনতায় ভুগলে প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।
ব্রণ হলে কী করবেন না:
- রোদে বেরুবেন না, রৌদ্র এড়িয়ে চলুন।
- তেলযুক্ত ক্রিম বা ফাউন্ডেশন ব্যবহার করবেন না।
- ব্রণে হাত লাগাবেন না। ব্রণ খুঁটবেন না।
- চুলে এমনভাবে তেল দেবেন না যাতে মুখটাও তেলতেলে হয়ে যায়।
- ব্রণ হলে একেবারেই আচার খাবেন না। তবে মিষ্টি চাটনি খেতে পারেন।
- বেশি পরিমাণে নিরামিষ খাবার খান। আমিষ খাবার যতটা সম্ভব না খাওয়ার চেষ্টা করুন।
- ডেইরি প্রোডাক্টসের মধ্যে হরমোনাল উপাদান বেশি পরিমাণে থাকে বলে তা খুব সহজে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এ কারণেই পনির, দুধ এবং দই কম খান।
- কোল ড্রিঙ্কস খাওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিন।
- আয়ুর্বেদের মতে অতিরিক্ত ক্রোধের ফলে শরীরে পিত্ত সঞ্চিত হয়। তাই ক্রোধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন।
ব্রণের ভেষজ চিকিৎসাঃ
ব্রণ থেকে মুক্তির সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে সচেতনতা। কিছু ভেষজ পদ্ধতি পরামর্শ এখানে উল্লেখ করা হল, যা আপনারা ঘরে বসেই করতে পারবেন।
- মধুঃ ব্রণের সমস্যা এত বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার যে তা যেন আপনার সমস্ত সৌন্দর্যকে ম্লান করে দেয়। নারী হন বা পুরুষ, মুখে ব্রণ কারো ক্ষেত্রেই ভালো লাগে না দেখতে। নানান রকম চিকিৎসা করিয়ে যারা হতাশ হয়ে পড়েছেন, তাঁদের জন্য রইলো ব্রণের আরেকটি ঘরোয়া চিকিৎসা। নিয়মিত ব্যবহারে ব্রণ ওঠা শূন্যের কোটায় চলে যাবে, আবার চট জলদি ব্রণ কমাতেও এর জুড়ি নেই। ত্বকের জন্য সর্বদা প্রাকৃতিক চিকিৎসাই সবচাইতে উপকারী! বিশুদ্ধ মধু সংগ্রহ করুন প্রথমেই। মধু একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক। ব্রণের প্রকোপ কমাতে ও দাগ দূর করতে এর জুড়ি নেই। মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে নিন খুব হাল্কা ফেসওয়াশ দিয়ে। তারপর ভালো করে মুখ ধুয়ে আলতো করে মুছে নিন। এবার আঙ্গুলের ডগায় মধু নিয়ে ভেজা ত্বকেই লাগান। অল্প একটু ম্যাসাজ করে ১০ মিনিট রাখুন। তারপর পানি দিয়ে খুব ভালো করে ধুয়ে নিন। অন্তত ২ ঘণ্টা মুখে কোন প্রসাধনলাগাবেন না।
- জলপাই তেল ম্যাসাজঃ আপনার ত্বক তৈলাক্ত কিংবা শুষ্ক যাই হোক না কেনো প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে জলপাই তেল দিয়ে পরিষ্কার করলে ত্বক মসৃণ হয় এবং ধীরে ধীরে ব্রণের উপদ্রব কমে যায়। প্রথমে হাতের তালুতে জলপাই তেল নিয়ে দুই হাতে ঘষে তেল কিছুটা গরম করে নিন। এবার এই তেলটা পুরো মুখে ভালো করে ম্যাসাজ করে নিন নিচের থেকে উপরের দিকে। এভাবে প্রায় ২ মিনিট ধরে মুখ ম্যাসাজ করুন। এভাবে ম্যাসাজ করলে ত্বক থেকে মেকআপ এবং ময়লা উঠে আসবে ভালো করে। এরপর কুসুম গরম পানিতে টাওয়েল ভিজিয়ে মুখের অতিরিক্ত তেল মুছে নিন ভালো করে। এভাবে প্রতিদিন রাতে মুখ পরিষ্কার করে নিলে ব্রণ ওঠা ধীরে ধীরে কমে যাবে।
- স্ক্র্যাবার হিসেবে বেকিং সোডাঃ আমাদের ত্বকে মরা চামড়া ও ব্ল্যাক হেডস জমে। এগুলোর জন্য ব্রণ হয় এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা হারায়। তাই ত্বককে মাঝে মাঝে স্ক্র্যাবিং করতে হয়। এক্ষেত্রে বেকিং সোডা বেশ ভালো স্ক্র্যাবার। প্রথমে বেকিং সোডা ও সামান্য পানি মিশিয়ে নিন। এবার এই মিশ্রণটি সারা মুখে, ঘাড়ে ও গলায় ভালো করে ম্যাসাজ করে নিন। এক মিনিট ম্যাসাজ করার পরে হালকা গরম পানি দিয়ে মুখ ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে তিন বার এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে ব্রণের উপদ্রব কমে যাবে, ব্রণের দাগ কমবে এবং ব্ল্যাক হেডস দূর হবে।
- চা-গাছের তেলঃ চা-গাছের তেলের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-সেপটিক ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান। কয়েক ফোঁটা চা-গাছের তেল তুলার মধ্যে লাগিয়ে খুব নরমভাবে ব্রণ ও দাগে লাগান। দেখবেন কয়েক দিনের মধ্যে ব্রণ সেরে উঠেছে।
- বরফঃ গোড়ালি মচকে গেলে এর ফোলা কমাতে বরফ কাজ করে। এটি ব্রণের প্রদাহ কমাতেও বেশ কার্যকর। একটি বরফের ছোট টুকরো পরিষ্কার কাপড়ের মধ্যে নিয়ে এক মিনিটের জন্য ব্রণের মধ্যে রাখুন। এই পদ্ধতি ব্রণের লাল হওয়া ও ফোলাভাব কমাবে।
- লেবুর রসঃ লেবুর রসের মধ্যে রয়েছে সাইট্রিক এসিড। রয়েছে এল-এসকোরোবিক এসিড, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টি অক্সিডেন্টের উৎস। একটি তুলোর টুকরোর মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে ব্রণে লাগান। সারা রাত রাখুন। ব্রন দূর করতে এই পদ্ধতিও বেশ কার্যকর।
- রসুনঃ রসুনের গন্ধ হয়তো আপনার বিরক্ত লাগতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান; যা ব্রণ দূর করে। রসুন দেহের বিভিন্ন রোগ-প্রতিরোধেও উপকারী। এটি ক্যানসার প্রতিরোধ করে। রসুনে রয়েছে এলিসিন ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। রসুন কেটে পানির সঙ্গে পেস্ট করুন। এরপর ব্রণের মধ্যে পাঁচ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন।
- মধুঃ ব্রণ দূর করতে মধুও খুব উপকারী। মিষ্টি স্বাদের এই খাবারটি আপনি মাস্কের মতো মুখে লাগাতে পারেন। পাঁচ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। এরপর ধুয়ে ফেলুন। এর ভেতর আছে অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি এবং অ্যান্টি সেপটিক উপাদান। তবে নিয়মিতি মধু ব্যবহারে ব্রণ একেবারেই সারবে কি না, সেটা নিয়ে গবেষকরা এখনো দ্বন্দ্বে রয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ, চেষ্টা করুন অপ্রক্রিয়াজাত বা টাটকা মধু ব্যবহার করতে।
- সরিষাঃ মুখে ব্রণ বা অন্য কোনও সমস্যা হলে সরিষা দারুণ কাজ করে। এতে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড রয়েছে যা সংক্রমণকে ধ্বংস করে দেয়। তাই টেবিল চামচের এক-চতুর্থাংশ সরিষা গুড়া নিয়ে তাতে মধু মিশিয়ে নিন। মুখে এই মিশ্রণটি ভালো করে মিশিয়ে ১৫ মিনিট রেখে মুছে ফেলুন।
- সবুজ চাঃ বেশি করে সবুজ চা ফুটিয়ে সেই পানি ঠান্ডা করে তা মুখে ব্রণের উপরে মাখুন।
- টমেটোঃ ত্বকের যেকোনো সংক্রমণ কমাতে টমেটো বিশেষ সাহায্য করে। টমেটো কেটে তার টুকরা বা রস বানিয়ে মুখে মাখুন। কিছুক্ষণ পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ব্রণের কালো-দাগ দূর করার উপায়ঃ
- অনেকেরই মুখে দেখা যায় ব্রণ ও কালো ছোপ ছোপ দাগ। এ জাতীয় ব্রণ ও কালো দাগ হলে প্রথম থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। ত্বকের ক্ষেত্রে অবহেলার ফল মারাত্নক হতে পারে। আর নষ্ট করে দিতে পারে আপনার সুন্দর চেহারার সৌন্দর্য মুখের এসব কালো দাগ ও ব্রণ দূর করার জন্য বাড়তি একটু পরিচর্যা দরকার আরও কিছু টিপস নীচে দেওয়া হলঃ
- ব্রণের দাগ ও ব্রণের উপর লবঙ্গ বেটে ৩০ মিনিট লাগিয়ে রাখবেন। ১ দিন পর পর টানা ১ মাস এভাবে লাগালে দাগ কমে যাবে। লবঙ্গে ঝাঁঝ থাকে বলে লাগানোর প্রথম ৫-৭ মিনিট ত্বক জ্বলবে, কিন্তু এতে ঘাবড়িয়ে যাবেন না। কিছুক্ষণ পর জ্বলা ঠিক হয়ে যাবে। প্রতিবার ই এমন হবে। লবঙ্গ বাটার সময় এতে একটু পানি মিশিয়ে নিবেন।
- ২ চামচ বেসন, ১ চা চামচ কাঁচা হলুদ বাটা, ১ চা চামচ কমলার খোসা বাটা একসাথে মিশিয়ে পেষ্ট তৈরি করুন। এবার এটা মুখে ঘাড়ে মাখিয়ে রেখে ১৫-২০ মিনিট পর মুখ ধুয়ে ফেলুন।
- আপেল এবং কমলার খোসা একসাথে বেটে এর সাথে ১ চামচ দুধ, ডিমের সাদা অংশ এবং কমলর রস মেশান। এবার মিশ্রনটা ত্বকে ২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেলুন।
- পাকা পেঁপের শাঁস মুখে মেখে নিন। ১ চামচ পাকা পেঁপের শাঁস ও ১ চামচ শশার রস মুখে মেখে নিন। ত্বক উজ্জ্বল হবে।
- একটি ডিম, ২ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল, একটি গোটা লেবুর রস ভালো করে মিশিয়ে নিন, এটি নখ, গলা, হাত ও ঘাড়ের কালো ছোপে ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে ব্রণের দাগ, হাত, ঘাড়ের কালো ছোপ ইত্যাদি সেরে যাবে।
- ২ চা চামচ চিনা বাদাম বাটা, ২ চা চামচ দুধের সর মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ১০-২০ মিনিট পর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ব্রণের দাগ মিলিয়ে যাবে।