পাইলট প্রশিক্ষণে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
রাজশাহীতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে এক প্রশিক্ষণার্থীর মৃত্যুতে দেশের ফ্লাইং ক্লাবগুলোর উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও ফ্লাইট নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ।পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক এক সভাপতি বলছেন, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি সংখ্যায় প্রশিক্ষণার্থীরা দুর্ঘটনায় পড়ছেন।
উড্ডয়নের জন্য তুলনামূলক নিম্ন মানের পুরনো উড়োজাহাজ ব্যবহারও বেশি দুর্ঘটনার পিছনে একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন একটি ফ্লাইং ক্লাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।এছাড়া উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও ফ্লাইট নিরাপত্তার দিকগুলোতেও ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হিসেবে, গত চার বছরে অন্য কোনো ফ্লাইং একাডেমির উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় না পড়লেও বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি দুর্ঘটনায় পড়েছে চারবার। এসব ঘটনায় মারা গেছেন সেখানকার দুইজন প্রশিক্ষণার্থী।
গত বুধবার দুপুরে রাজশাহীর শাহ মাখদুম বিমানবন্দরের রানওয়েতে এই ফ্লাইং একাডেমির একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন প্রশিক্ষনার্থী তামান্না রহমান। এ দুর্ঘটনায় ফ্লাইং একাডেমির প্রশিক্ষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাঈদ কামালও আহত হন।
তামান্নার লাশ গাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার স্বজনরা। নিহত তামান্নার বাবা ডা. আনিসুর রহমান দুর্ঘটনার জন্য বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির ‘অব্যবস্থাপনাকে’ দায়ী করেছেন।তিনি বলেন, “আমার মেয়ে বলেছিল, তাদের (ফ্লাইং একাডেমি) ভালো প্রশিক্ষক নেই, উড়োজাহাজগুলোও ভালো না।এরা যদি আপ টু ডেট না থাকে তারা কিভাবে একাডেমি চালায়,” প্রশ্ন করেন তিনি।মানসম্মত উড়োজাহাজ ও প্রশিক্ষক না থাকলে ফ্লাইং ক্লাব বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগ প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, “সরকারের কাছে অনুরোধ করবো এগুলো বন্ধ করে দেন। এভাবে আর মানুষ হত্যা বন্ধ করেন।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলমও মনে করেন ফ্লাইং একাডেমিগুলোর নিরাপত্তার দিকে আরো নজর দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে বেশ কিছু দুর্ঘটনা আমরা দেখেছি, এগুলো অ্যালার্মিং। আমার মনে হয় তাদের (বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেশি) কিছুটা ল্যাকিংস ছিল। দেশের অন্যতম পুরাতন এ ফ্লাইং একাডেমিটি গত কয়েক বছর ধরে তাদের সুনাম ধরে রাখতে পারছে না।
বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন এস এম হেলাল বলেন, “আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা হলো ট্রেইনিং একাডেমিই বলুন বা এয়ারলাইন্স উড়োজাহাজের প্রোপার মেইনটেনেন্স(রক্ষণাবেক্ষণ) হয় না। আর ফ্লাইট প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে একাডেমিগুলো এখনও রাজনৈতিকায়নের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তিনি বলেন, “ফ্লাইং ক্লাবগুলো কতটুকু ট্রেইনিং ও ফ্লাইং সঠিকভাবে সম্পন্ন করছে, যারা তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তাদের স্কিল কতটুকু ফুলফিল করছে আর সর্বোপরি সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এগুলো সম্বন্ধে কতটুকু সজাগ- এ সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় হয়েছে।যে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে রেশিও হিসেব করলে এটি কিন্তু অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় ৫০ ভাগ বেশি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের হিসেবে বর্তমানে দেশে ফ্লাইং একাডেমি আছে পাঁচটি। এর মধ্যে সিভিল এভিয়েশন ট্রেইনিং সেন্টার ও বিমানের বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ট্রেইনিং সেন্টার সরকারি। বাংলাদেশ ফ্লাইং অ্যাকাডেমি অ্যান্ড জেনারেল এভিয়েশন ছাড়া বাকি দুটি ফ্লাইং একাডেমি হচ্ছে- আরিরাং এভিয়েশন লিমিটেড এবং গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমি। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের তত্ত্বাবধানে টিএসি এভিয়েশন নামে আরেকটি ফ্লাইং একাডেমি নিবন্ধন পেলেও এখনও কাজ শুরু করেনি তারা।
গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, “এখন আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরনের প্রশিক্ষণ বিমান ব্যবহার করা হয়- দুই আসনের সেসনা-১৫২ এবং চার আসনের সেসনা-১৭২। যে উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়েছিল সেটি ছিলে সেসনা-১৫২ মডেলের। বিশ্বের অন্য সব দেশে এখন প্রশিক্ষণের জন্য সেসনা-১৭২ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেসনা-১৫২ অন্য কোথাও ব্যবহার করা হয় না। আমাদের দেশে যে বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজই সেসনা-১৫২ মডেলের, এগুলো বেশ পুরাতন।
এর আগে ২০১০ সালে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলের দত্তকান্দি গ্রামের পাশে যমুনা নদীতে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বৈমানিক কামরুল হাসান মারা যান।সেই প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজটিও ছিল সেসনা-১৫২ মডেলের।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুসারে ২০ বছরের পুরাতন কোনো উড়োজাহাজ দেশের আকাশে চলাচলের অনুমতি নেই।আর প্রশিক্ষণ উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সেসনার নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ২৪শ ঘণ্টা উড্ডয়নের পর উড়োজাহাজের ইঞ্জিন পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সেসনা-১৫২ মডেলের যে বিমানটি ওড়াতে গিয়ে তামান্না দুর্ঘটনায় পড়েন সেটি ১৯৮৫ সালে তৈরি বলে তার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফ্লাইং অ্যাকাডেমির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন।
ফ্লাইং একাডেমিগুলো যেসব সমস্যার মুখে পড়ছে তার মধ্যে ‘ভালো প্রকৌশলী না থাকাকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে এক শতাংশও প্রকৌশলী নেই। দেশের বাইরে থেকে প্রকৌশলী এনে আমাদের কাজ করতে হয়। আমার মনে হয় এটা একটা বড় সমস্যা।
ফ্লাইং অ্যাকাডেমির সাহাবুদ্দিন বলেন, “আমাদের রেপুটেশন অনেক ভালো ছিল। আমাদের একাডেমিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান না হওয়ায় অন্যান্য ফ্লাইং একাডেমির থেকে এখানে খরচ অনেক কম। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ছোট বড় দুর্ঘটনায় আমাদের পড়তে হয়েছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে মেইনটেনেন্স ভালো না বলে যে কথাটা উঠছে এটির সাথে আমি একমত নই। আমরা সব সময়ই নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কেউই চায় না দুর্ঘটনা হোক, যে মেয়েটি মারা গেল তার একটি ভালো ক্যারিয়ার হতে পারতো।
১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দেশের প্রবীণতম এ ফ্লাইং একাডেমি থেকে আটশ পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।বর্তমানে তাদের একাডেমিতে ৬০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবছর দেশে প্রায় ২০ জন পাইলটের চাহিদার বিপরীতে ফ্লাইং একাডেমিএগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বেরোচ্ছেন প্রায় ১০ জন। একজন পাইলটকে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চালানো শিখতে খরচ করতে হয় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।
২০২০ সালে সারা বিশ্বে প্রায় ২০ হাজার পাইলটের চাহিদা তৈরি হবে।
ঢাকার আকাশে ‘এয়ার ট্রাফিক’ বেশি থাকায় রাজশাহী শাহ মাখদুম বিমানবন্দরেই বেশিরভাগ ফ্লাইংয়ের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। আর ঢাকায় দেওয়া হয় তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ। এছাড়া সিলেট ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও স্বল্প পরিসরে ব্যবহারিক ফ্লাইং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরামর্শক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এইচ এম আকতার খান বলেন, “আমাদের এখানে যে হারে উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় সে হিসেবে কিন্তু দুর্ঘটনা অনেক কম। তবে আমাদের কনসার্ন হলো-একটি দুর্ঘটনাই বা কেন হবে। এ কারণে আমরা সব সময় সেফটিকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। নিরাপত্তার প্রশ্নে কখনোই ছাড় নয়। প্রতিদিন বিভিন্ন ফ্লাইং একাডেমি মিলে প্রায় ৫০ ঘণ্টা ফ্লাই করে বলে জানান তিনি।
তামান্না বাবার অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “তিনি মেয়ে হারিয়েছেন, এই অভিযোগ করার অধিকার অবশ্যই তার আছে। আমরা তদন্ত করছি, কোন গাফিলতি আছে কি না তা তদন্ত শেষ হলে বলতে পারব।
সূত্রঃ বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা, ৪ মে ২০১৫